ইসরায়েলি কারাগারের একটি কক্ষ। সেখানে টানা পাঁচ দিন চোখ বেঁধে রাখা হয়েছিল ফিলিস্তিনি সাংবাদিক আহমেদ আবদেল আলকে। বিবস্ত্র করে চলত প্রহার। কানের কাছে প্রচণ্ড শব্দে বাজানো হতো হিব্রু ও ইংরেজি গান। যন্ত্রণায় যখনই জ্ঞান হারাতেন, তখনই বৈদ্যুতিক শক বা লাঠির আঘাতে তাকে জাগিয়ে তোলা হতো।
আহমেদ আবদেল আল একা নন, তার মতো অন্তত ৫৯ জন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ইসরায়েলি কারাগারে কাটানো দিনগুলোকে ‘নরক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) গত ৪ অক্টোবর ২০২৩ থেকে মুক্তি পাওয়া সাংবাদিকদের ওপর একটি বিস্তারিত অনুসন্ধান চালিয়ে এই ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সাংবাদিকদের ওপর চালানো অমানবিক শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের চিত্র। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাংবাদিক জানান, বন্দিরা নির্দিষ্ট কিছু কক্ষকে ‘ডিসকো রুম’ বলে ডাকতেন। সেখানে উচ্চশব্দে গান বাজিয়ে তাদের ঘুমাতে দেওয়া হতো না। এমনকি জিপ-টাই দিয়ে তার জননাঙ্গ বেঁধে মারধর করা হয়, যার ফলে পরে প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত বের হতো। সেনারা তাকে বলেছিল, ‘তুমি আর পুরুষ থাকবে না।’ সিপিজে বলছে, অন্তত ১৭ জন সাংবাদিক তাদের ওপর যৌন সহিংসতার কথা জানিয়েছেন এবং ১৯ জন অবমাননাকর নগ্ন করে তল্লাশির শিকার হয়েছেন।
৫৯ জন সাংবাদিকের মধ্যে ৫৮ জনই জানিয়েছেন যে তারা নির্যাতন বা সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৬ জন জানিয়েছেন তাদের পাঁজরের হাড় ভেঙে দেওয়া হয়েছে বা মেরুদণ্ডে আঘাত করা হয়েছে। বন্দিদের ওজন গড়ে ২৩.৫ কেজি পর্যন্ত কমে গেছে। সাংবাদিক আহমেদ শাকুরা ১৪ মাসে ৫৪ কেজি ওজন হারিয়েছেন।
ক্ষতস্থানে পচন ধরলেও চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। এক সাংবাদিকের চোখের দৃষ্টি সাময়িকভাবে চলে গিয়েছিল। সিপিজের তথ্যমতে, ২০২৩ সাল থেকে অন্তত ৯৪ জন ফিলিস্তিনি সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। বর্তমানে ৩০ জন এখনও কারাগারে আছেন। মুক্তিপ্রাপ্তদের অধিকাংশকেই (৪৮ জন) কোনও অভিযোগ ছাড়াই ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিটেনশন’-এর আওতায় আটকে রাখা হয়েছিল।
কারাগার থেকে বের হওয়ার সময় অনেককে হুমকি দেওয়া হয়েছে। সাংবাদিক মোহাম্মদ আল-আত্রাশকে বলা হয়েছিল, ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় যদি শুভ সকাল-ও লেখো, আমরা তোমাকে খুঁজে বের করব।’ আল জাজিরার সাংবাদিক আমিন বারাকাকে তার পরিবারকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। এসব অভিযোগের বিষয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এবং কারা কর্তৃপক্ষ সুনির্দিষ্ট কোনও জবাব দেয়নি। তারা দাবি করেছে, বন্দিদের আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী রাখা হয়। তবে ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা বি’তসেলেম এই ডিটেনশন সেন্টারগুলোকে ‘নির্যাতন ক্যাম্পের নেটওয়ার্ক’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
জাতিসংঘের নির্যাতন বিরোধী কমিটি (সিএটি) ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো এই ‘পদ্ধতিগত ও ব্যাপক’ নির্যাতনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সিপিজের আঞ্চলিক পরিচালক সারা কুদাহ বলেন, ‘এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়। সাংবাদিকদের ভয় দেখাতে এবং গাজা ও পশ্চিম তীরের খবর বাইরে আসা বন্ধ করতে এটি একটি পরিকল্পিত কৌশল।’
আই.এ/সকালবেলা