স্পেসএক্সের আইপিও ঘোষণা ট্রিলিয়নিয়ার হচ্ছেন মাস্ক
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক : বিশ্বের শীর্ষ ধনী প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের মালিকানাধীন বিখ্যাত মহাকাশ প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘স্পেসএক্স’ মার্কিন শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার ঐতিহাসিক পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রথমবারের মতো সাধারণ বিনিয়োগকারী ও সাধারণ মানুষ কোম্পানিটির মালিকানার অংশীদার বা শেয়ার কেনাবেচা করার সুযোগ পাবেন।
আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) বিকেলে ব্রিটিশ প্রভাবশালী গণমাধ্যম বিবিসি-র একটি বিশেষ প্রতিবেদনে স্পেসএক্সের এই চাঞ্চল্যকর আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) ঘোষণার তথ্যটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রকাশ পায়।
মহাকাশ বিজ্ঞানে বিপ্লব আনা স্পেসএক্স মূলত আধুনিক রকেট ও মহাকাশযান তৈরি, ‘স্টারলিংক’ ব্র্যান্ডের অধীনে বিশ্বব্যাপী উপগ্রহভিত্তিক উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা প্রদান এবং একই সঙ্গে মাস্কের আলোচিত ও বিতর্কিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘এক্সএআই’ (xAI)-এর মূল নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কাজ করে থাকে। মার্কিন ওয়াল স্ট্রিটের ইতিহাসে এই প্রাথমিক শেয়ার বিক্রির প্রক্রিয়াটি এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় আইপিও হতে পারে বলে ধারণা করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। আগামী মাস থেকেই মার্কিন স্টক এক্সচেঞ্জে ‘এসপিসিএক্স’ (SPCX) কোড বা প্রতীকে কোম্পানিটির শেয়ারের আনুষ্ঠানিক লেনদেন শুরু হতে পারে।
স্পেসএক্সে নিজের একক মালিকানাধীন শেয়ারের আকাশচুম্বী মূল্যের ওপর ভর করে এই তালিকাভুক্তি ইলন মাস্ককে ইতিহাসের প্রথম ‘এক ট্রিলিয়ন’ বা লাখ কোটি ডলারের নিট সম্পদের মালিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, তিনি ইতিমধ্যেই বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন।
আইপিও-র নথিতে স্পেসএক্স নিজেদের সামগ্রিক বাজারমূল্য নির্ধারণ করেছে অবিশ্বাস্য ১ দশমিক ২৫ ট্রিলিয়ন (১ লাখ ২৫ হাজার কোটি) ডলার। কোম্পানির সিংহভাগ শেয়ারের একক মালিক স্বয়ং ইলন মাস্ক হওয়ায়, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পর কেবল স্পেসএক্স থেকেই তাঁর ব্যক্তিগত অংশের মূল্য দাঁড়াবে ৬০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এর আগে গত বছর বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার (Tesla) প্রধান হিসেবে মাস্ক ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি একক সম্পদের মালিক হওয়ার রেকর্ড গড়েছিলেন। ফলে স্পেসএক্স শেয়ারবাজারে এলে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ অনায়াসেই এক ট্রিলিয়ন ডলারের জাদুকরী ল্যান্ডমার্ক স্পর্শ করবে।
এই আইপিও আবেদনের নথির মাধ্যমে স্পেসএক্সের অভ্যন্তরীণ আর্থিক অবস্থার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ও গোপন কিছু চিত্রও প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে প্রকাশ পেয়েছে। নথি অনুযায়ী, গত বছর ‘স্পেস এক্সপ্লোরেশন টেকনোলজিস’ নামে আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত এই কোম্পানিটি মোট ১৮ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলার আয় বা রেভিনিউ জেনারেট করেছিল। তবে বিশাল আয়ের বিপরীতে বিপুল বিনিয়োগের কারণে গত বছর তাদের নিট লোকসান ছিল ৪ দশমিক শূন্য ৯ বিলিয়ন ডলার।
এমনকি চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (প্রথম প্রান্তিক) কোম্পানিটি ৪ দশমিক শূন্য ৭ বিলিয়ন ডলারের সেবা বিক্রি করতে সক্ষম হলেও, গবেষণা ও অবকাঠামো খাতের ব্যয়ের কারণে তাদের নিট লোকসান হয়েছে ৪ দশমিক শূন্য ৩ বিলিয়ন ডলার। তাদের নিজস্ব হিসাব বিবরণী অনুযায়ী, শক্তিশালী রকেট, স্টারলিংক স্যাটেলাইট ও আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ স্পেসএক্সের মোট স্থায়ী সম্পদের পরিমাণ ১০২ বিলিয়ন ডলার হলেও, একই সঙ্গে বিশ্ববাজার ও বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেওয়া কোম্পানিটির মোট দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬০ দশমিক শূন্য ৫ বিলিয়ন ডলারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক খ্যাতনামা বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ‘সিট্রিন ভেঞ্চার পার্টনার্স’-এর ব্যবস্থাপনা অংশীদার রুথ ফক্স-ব্লেডার এই আর্থিক খতিয়ানের বিষয়ে বিবিসিকে বলেন, “স্পেসএক্সের মতো এত বিশাল ও দূরদর্শী কোনো মেগা প্রজেক্ট শেয়ারবাজারে আসার প্রাথমিক সময়েও নিট লোকসানে থাকাটা ফিন্যান্সিয়াল ব্যাকগ্রাউন্ডে একদমই কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। এই আইপিও চালুর পরিকল্পনাটি আমাদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যাশিত ছিল, তবে তা সত্ত্বেও এটি বিশ্ববাজারের জন্য অত্যন্ত রোমাঞ্চকর।” তিনি আরও যোগ করেন, “স্পেসএক্স একটি সাধারণ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি যুগান্তকারী ও বিস্তৃত প্রকল্প, যার অসংখ্য বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে এবং যা মূলত মানবসভ্যতার ভবিষ্যতের দিকেই ইঙ্গিত করে।”
তবে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার পাশাপাশি আইপিও নথিতে স্পেসএক্স এটাও স্পষ্ট জানিয়েছে যে, বিশ্বব্যাপী চলমান বিভিন্ন আইনি জটিলতা ও মামলার কারণে তাদের সম্ভাব্য আইনি লড়াইয়ের খরচ বাবদ অর্ধ বিলিয়ন (৫০ কোটি) ডলারেরও বেশি অর্থ আলাদা করে তুলে রাখতে হতে পারে।
একই সাথে এক বিবৃতিতে ইলন মাস্ক জানিয়েছেন, তিনি তাঁর নতুন এআই স্টার্টআপ ‘এক্সএআই’ (xAI)-কে সম্পূর্ণ আলাদা একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিলুপ্ত করে দিয়ে সেটিকে স্পেসএক্সের একটি বিশেষায়িত উইং বা অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালনা করতে চান। এর ফলে স্পেসএক্সের অধীনেই তাদের মূল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কার্যক্রম পরিচালিত হবে। উল্লেখ্য, বর্তমান স্পেসএক্সের সামগ্রিক করপোরেট মালিকানাধীন কাঠামোর অধীনেই রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার), যা বিশ্বব্যাপী মাস্কের প্রযুক্তি সাম্রাজ্যকে আরও সুসংহত করবে।
জান্নাত সকালাবেলা