পান রপ্তানিতে বছরে ১ হাজার কোটি টাকা আয়ের বিশাল সম্ভাবনা
অনলাইন ডেস্ক: দীর্ঘ দুই যুগের অভ্যন্তরীণ আইনি বিরোধের অবসান ঘটে বর্তমানে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ থেকে পানের রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। সৌদি আরব, কানাডা, ফ্রান্স ও ইতালিসহ বিশ্বের প্রায় ৩৩টি দেশে এখন নিয়মিত যাচ্ছে দেশের পান। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরকারি নীতিগত ও প্রশাসনিক সহায়তা নিশ্চিত করে পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারলে কেবল পান ও পানজাত পণ্য রপ্তানি করেই বছরে এক হাজার কোটি টাকার বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।
এক প্রতিবেদনে আজকের পত্রিকা জানিয়েছে, আশির দশক থেকে বিদেশে পান পাঠানো শুরু হলেও মূলত ২০০৩ সালে ‘বাংলাদেশ পান রপ্তানিকারক সমিতি’ গঠনের পর স্বাধীন পণ্য হিসেবে পানের বড় বাজার তৈরি হয়। তবে একই সময়ে পানের পরিচয় ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব নিয়ে ‘বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড এলাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন’ (সবজি সমিতি)-এর সঙ্গে পান রপ্তানিকারক সমিতির বিরোধ শুরু হয়।
এক পক্ষের অভিযোগ ছিল, সবজি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে পান রপ্তানির মাধ্যমে সরকারের বিপুল রাজস্ব ফাঁকি ও হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচার করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রতিপক্ষের দাবি ছিল, পানকে আলাদা পণ্য হিসেবে দেখিয়ে নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগে দুই যুগ ধরে আদালতে ডজনেরও বেশি মামলা চলে।
অবশেষে ২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ চূড়ান্ত রায়ে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন—‘বাংলাদেশ পান রপ্তানিকারক সমিতি’ এবং ‘সবজি সমিতি’ দুটি সম্পূর্ণ পৃথক সত্তা। সবজি সমিতি কোনোভাবেই পান সমিতির অভ্যন্তরীণ বা প্রশাসনিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
সর্বোচ্চ আদালতের এই রায়ের পর রপ্তানিকারকরা নতুন উদ্যমে বাণিজ্য সম্প্রসারণে মনোযোগী হয়েছেন। পান রপ্তানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিন সিকদার বলেন, “দীর্ঘ ২৪ বছর মামলা-মোকদ্দমায় জর্জরিত থাকায় আমরা আন্তর্জাতিক বাজারে কাঙ্ক্ষিত মনোযোগ দিতে পারিনি। রায়ের পর এখন নতুন করে বাজার দখলের কাজ শুরু করেছি।” অন্যদিকে ফল ও সবজি রপ্তানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মনসুরও স্বাধীনভাবে পান ব্যবসায়ীদের এগিয়ে যাওয়ার শুভকামনা জানিয়েছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, পানের উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক আধুনিক ও উন্নত হয়েছে। ফলে এর গুণগত মান বাড়ায় রপ্তানিও ধারাবাহিক বৃদ্ধিমুখী। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪,৩৮৮.৯৬ মেট্রিক টন পান রপ্তানি হয়েছে, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ৩,৬৫৯.৭১২ মেট্রিক টন। বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি পান আমদানিকারক দেশ হলো সৌদি আরব।
রপ্তানিকারকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা, যুক্তরাজ্যসহ সমগ্র ইউরোপে ২০০ কোটি টাকা এবং পাকিস্তানে ৩০০ কোটি টাকার বাংলাদেশি পানের বিশাল বাজার রয়েছে। এছাড়া মালয়েশিয়া, ইতালি, গ্রিস ও লেবাননসহ ৩৩টি দেশে পানের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সুনির্দিষ্ট সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই উদ্যানতাত্ত্বিক ফসলটি দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম।